×

ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

টঙ্গীতে মাদ্রাসাশিক্ষককে চড়, অভিযুক্তকে খুঁজছে পুলিশ

২০২৬ অক্টোবর ২৪ ২১:০২:৫৯

টঙ্গীতে মাদ্রাসাশিক্ষককে চড়, অভিযুক্তকে খুঁজছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার কাছে টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির এক শিশুকে ‘চুমু’ দেওয়ার অভিযোগে এক শিক্ষককে চড় মারার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিশুটির বাবার অভিযোগ, ওই শিক্ষক তাঁর সন্তানকে যৌন হয়রানি করেছেন। বিষয়টি বাবা-মাকে জানালে শিশুটিকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই শিশুটির বাবার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেছেন। দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে অনেকে সমালোচনা করছেন এবং এ বিষয়ে আলেমদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

অন্যদিকে, মাদ্রাসাশিক্ষকদের একাংশসহ আরেকটি পক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

এ ঘটনায় শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ শিশুটির বাবাকে আসামি করে পাল্টা মামলা করেছেন।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘উভয় পক্ষে দুটি মামলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষককে আমরা আগেই আটক করেছি। পরে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আরেকটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় এজাহার নামীয় আসামিকে গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি।’

এজাহারনামীয় আসামি শিশুটির বাবা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’।

পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের করা মামলায় মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ১৭ লাখ টাকা লুট করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

এদিকে, শিশুটির বাবা শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন। একই সঙ্গে মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।

মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর দাবি, ঘটনাটি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র।ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছেটঙ্গীর ওই মাদ্রাসার শিক্ষককে সজোরে চড় মারার একটি ভিডিও বৃহস্পতিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি ‘কিসের চুমুরে’ বলে আরেক ব্যক্তিকে থাপ্পড় মারছেন। এরপর আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে মারধর করেন। পরে স্থানীয় লোকজন জড়ো হলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

পরে জানা যায়, যিনি চড় মেরেছেন, তিনি ওই মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা। আর যাঁকে চড় মারা হয়েছে, তিনি ওই মাদ্রাসার শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল।

ভিডিওতে চড় মারার আগে ওই শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ‘স্টুডেন্টদের সাথে অন্য রকম সম্পর্ক। সবার সাথে, বিশেষ করে ক্লাস ওয়ানের। তার এক পর্যায়ে আমি বললাম, চুমু।’

এ সময় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি ‘কীসের চুমুরে’ বলে তাঁকে থাপ্পড় মেরে ফেলে দেন।পাল্টাপাল্টি অভিযোগঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শিশুটির বাবা। নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও তিনি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

তিনি দাবি করেন, কী ঘটেছিল, তা জানতে তিনি ওই শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ‘সবার সামনে সে বলতেসে আমি তার সাথে (শিশুটির সঙ্গে) জোরাজোরি করেছি, চুমু দিয়েছি। ‘জোরাজুরি’ পর্যন্ত শোনার পর আমি কিন্তু কিছু করিনি। কিন্তু ‘চুমু’ এটা শোনার পর ওই মোমেন্টে অ্যাজ অ্যা গার্ডিয়ান আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। এরপর যা ঘটেছে আপনারা দেখেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কোনো ‘মব’ তৈরি করতে নয়, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে শিশুটির বাবাকে সাংবাদিকদের সামনে বলতে শোনা যায়, চুমুর কথা বাবা-মাকে জানালে শিশুটিকে মেরে ফেলা হবে—এমন হুমকি দিয়েছিলেন ওই শিক্ষক।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে লুটপাটের যে অভিযোগ তুলেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শিশুটির বাবা। সেখানে যাওয়ার ভিডিও ফুটেজও তাঁর কাছে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঘটনার সময় ওই শিক্ষক বলছিলেন, ‘সকল বাচ্চাদের তিনি বলেছেন যে ‘রেজাল্ট ভালো করলে পাপ্পি দিবো’। তিনি দিয়েছেন—এমনটি বলেননি।’

অধ্যক্ষের দাবি, শিশুটির মা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সন্তান বাসায় গিয়ে বলেছে, শিক্ষক ‘রেজাল্ট ভালো হলে চুমু দিবো’ বলেছেন। এরপর ওই শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়।

অধ্যক্ষ বলেন, ‘ওই শিক্ষক তখন বলেছেন যে তিনি সবার উদ্দেশে বলেছেন, কাউকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। আর এমন ঘটনাও ঘটেনি। শিক্ষক বলেছেন যে (চুমু) দিবেন, তিনি দেননি।’

অধ্যক্ষের আরও দাবি, ‘এরপরেও শিশুটি ক্লাসে এসেছে। অভিযোগ সত্যি হলে লম্পট শিক্ষকের ক্লাসে তারা (শিশুর অভিভাবক) আবার পাঠাবেন কেন?’

তিনি জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক ওই মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পড়ান।

শিশুটির বাবার করা মামলায় বলা হয়েছে, মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে। এর আগে বুধবার শিশুটির পরিবারের দুই সদস্য মাদ্রাসায় গিয়ে ওই শিক্ষকের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।

ঘটনাস্থলেই সাংবাদিকদের কাছে শিশুটির বাবা অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত শিক্ষক তাঁর মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন। এ কারণেই তিনি মামলা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘থাপ্পড় দিয়ে আমি কোনো আলেম বা শিক্ষকে অপমান করিনি। আমি একজন দুশ্চরিত্র লম্পটকে আমি থাপ্পড় দিয়েছি।’সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়াদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ বাড়তে থাকার প্রসঙ্গ তুলে অনেকে শিশুটির বাবার প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন। ফেসবুকে চড় মারার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মিম ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটিকে সমর্থন করেন কি না, তা জানতে চেয়েও অনেকে জরিপ বা পোল প্রকাশ করেছেন।

ফেসবুকে একজন লিখেছেন, ‘সন্তানের জন্য প্রতি বাবাকে এভাবেই দাঁড়াতে হবে।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘উনি সকল বাবাদের শিখিয়ে দিলেন কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, উনি যদি হেরে যায় হেরে যাবে বাংলাদেশ।’

অন্যদিকে, মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনেকে ওই শিক্ষককে মারধরের সমালোচনা করছেন।

মাওলানা দিদার আহমেদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মিথ্যা অপবাদ দিয়ে প্রকাশ্যে প্লিম স্টাইলে মাদ্রাসার শিক্ষককে মারধর করে সন্ত্রাসীরা। শিক্ষক নাকি ছাত্রী কে চুমা দিছে! যদি দিয়ে থাকে তাহলে মাদ্রাসা কমিটি আছে, দেশে আইন আছে, প্রমাণ ছাড়া সে কেনো এভাবে মারবে?’

মো. মাহাদী হাসান নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘মাদ্রাসার ভেতরে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা—এ কেমন বিচার?’

ঘটনাটি নিয়ে আলোচনার মধ্যে কিছু মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণ সম্পর্কে ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন অনেকে।

মাদরাসাতুত তাকী আল ইসলামিয়াহ তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় বলেছে, ‘শিশু ইতস্তত বোধ করে এমন কিছু করা যাবে না। আমাদের কোনো টিচার যদি কোনো শিক্ষার্থীর সাথে অপকর্ম করার কথা চিন্তাও করে সে যেন চলে যায়। কারণ এমন দুর্ঘটনা আমাদের মাদ্রাসায় ঘটলে অভিভাবকের চেয়ে বেশি শাস্তি আমরাই দিবো।’

মাদরাসাতুজ জয়তুনা তাদের যাচাইকৃত ফেসবুক পাতায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোখতার আহমদকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘কোনো শিক্ষকই কোনো শিক্ষার্থীকে চুমু দেওয়া, ব্যাড টাচ করার সামান্যতম বৈধতা নেই। এটি কওমে লুতের পাপা। এমন পাপিষ্ঠরা কঠিনতম শাস্তি পেতেই হবে। আমার পরিবারের কারও বিষয়ে এমন কিছু ঘটলে ঘটনা ভিন্ন কিছু হতো না।’

ইসলামবিষয়ক লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে শিশুদের ঘিরে প্রায়ই নেতিবাচক খবর আসছিল। এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছিল।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এর মধ্যেই টঙ্গীর ঘটনা ঘটলো। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষগুলোকে শিশুদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক শিশু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতেই হবে। আর অভিভাবকদেরও সচেতন হয়ে দেখতে হবে যে তারা সন্তানকে যেখানে দিচ্ছেন সেটি ঠিক আছে কি-না।’যথাযথ আচরণ নিশ্চিতের নির্দেশনা আছেবাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই আলোচনায় আসে। শারীরিক শাস্তি হিসেবে প্রহারের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের যৌন নিপীড়নের বেশ কিছু অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মাদ্রাসায় কমবেশি ঘটে আসছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ছয়টি মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সেটি সক্রিয় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির সভায় নির্দেশনাটি চূড়ান্ত হয়।

নির্দেশনার ‘শাসনের শরয়ী সীমা নির্ধারণ’ অংশে বলা হয়েছে, ‘লাঠি, বেত বা কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল-মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণও পরিহারযোগ্য।’

নির্দেশনায় আরও জানানো হয়েছে, এসব সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা শরিয়ত ও বিধি—উভয় দৃষ্টিতেই জবাবদিহির আওতায় থাকবেন।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

জাতীয় এর অন্যান্য সংবাদ